www.agrovisionbd24.com
শিরোনাম:

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কিছু কথা

 এস এ    [ ৮ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ১১:২৫   মতামত বিভাগ]



আজ শিক্ষক দিবস। শিক্ষার্থীরা তাদের ফেসবুক টাইমলাইনে প্রিয় শিক্ষকের স্মৃতিচারণা করছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। যে মানুষগুলো আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারেন তারাই তো আমাদের আদর্শ শিক্ষক। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, অধিকাংশ শিক্ষার্থী (২/১ জন বাদে) তাদের নিজের জীবনের শিক্ষকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের বেছে নিয়েছেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে থেকেই। আমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, আমার জীবনের সেরা শিক্ষক গুলো নির্বাচন যদি আমি করি, তারা সকলেই আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠ ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল ও কলেজ কুমিল্লা সেনানিবাস এর।

এর উল্টো পিঠ ও দেখলাম। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের হতাশা ফেসবুকের টাইমলাইন জুড়ে। অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা (শিক্ষার্থীদের ভাষায়) কোন ভূমিকাই রাখতে পারছিনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জীবনে। অনেকে তাদের জীবনকে ধ্বংস করে দেবার জন্য শিক্ষকদের দায়ী করেছেন। আমি শিক্ষার্থীদের মনোভাবের প্রতি সম্মান জানিয়ে শুধু বুঝতে চেষ্টা করছি, কেন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জীবনে আলোকবর্তিকা হতে পারছি না। অথচ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরাই কেবলমাত্র (আমি বিশেষ করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কথা বলছি) শিক্ষার্থীদের সাথে কোন অর্থনৈতিক সম্পর্কে নেই, বুঝাতে চাইছি, প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক তিনটি ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়িয়ে থাকেন। কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন (অনেকের ক্ষেত্রে সহমত নাও থাকতে পারে) ক্লাসে শিক্ষার্থীদের পরিয়ে দেবার। তার মানে দাঁড়ায়, অর্থনৈতিক সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে চীনের মহাপ্রাচীরের মতো একটি দেয়াল বর্তমান।

আমি সত্যিকারভাবেই বুঝতে চাইছি, কেন আমি কিংবা আমার সহকর্মীরা আমাদের শিক্ষার্থীদের জীবনে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছি না।

১. আমার কাছে কেন যেন মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রধান যে দূরত্ব, সেটি একাডেমিক বা শিক্ষা সংক্রান্ত। আমি যখন প্রাথমিক, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করছি, আমি জানি এখানে ভালো ফলাফল করলে কিংবা শিক্ষকদের কথা মেনে চললে আমি সফল হতে পারব। আমি এসএসসিতে কিংবা এইচএসসিতে ভালো ফলাফল করলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা যে পেশাতেই যেতে চাই তা হতে পারব (আমি মেনে নিচ্ছি সবাই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায় না)।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উল্টো। আমি যদি ভেটেরিনারি সায়েন্স এ কিংবা কৃষি অনুষদে (অন্যান্য সকল অনুষদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য)ভালো ফলাফল করি, আমি কিন্তু ভেটেরিনারি সার্জন কিংবা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হতে পারব না (আমি ৭% কোটায় শিক্ষক ক্যান্ডিডেটদের কথা বলছি না)। তাহলে ভেটেরিনারি সার্জন বা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হতে হলে আমাকে একাডেমিক সিলেবাসের পড়া বাদ দিয়ে বিসিএসের পড়ায় মনোনিবেশ করতে হবে।

আমার মনে হয় সকল সমস্যার মূল এটাই। একজন শিক্ষক যদি তিনি আদর্শ শিক্ষক হতে চান, তাহলে তাকে ক্লাস-পরীক্ষা এবং একাডেমিক সিলেবাস সম্পন্ন করতে হবে। আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে সকল শিক্ষক ভালো পড়ান ভালোভাবে ক্লাস নেন কিংবা পরীক্ষা নেন, তাদের ক্লাস গুলোকে অনেকটা প্যারা হিসেবে মনে করা হয়। সমস্যাটা এখানেই, আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে যখন ভালো শিক্ষক (কেবলমাত্র একাডেমিক ক্ষেত্রে) হবার চেষ্টা চালাচ্ছি, তখন আমার শিক্ষার্থীর কাছে সেই চেষ্টার মূল্য টুকু নেই। কারণ এই শিক্ষা সিস্টেমের কারণে তার জন্য কোন শুভ ফলাফল বয়ে আনছে না বলে সে বিশ্বাস করে।

শিক্ষার্থীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ এর কারনে আমি জানি, এই প্যারা দেওয়ার শিক্ষকদের শিক্ষার্থীরা ততটা ভালোভাবে নেয় না। আমি নিজের কানে অনেক এমএস শিক্ষার্থীদের বলতে শুনেছি, স্যারের জন্য বোধহয় আমার বিসিএস পরীক্ষায় পাশ করা সম্ভব হলো না। সমস্যাটা সিস্টেমের। একজন শিক্ষক হয়তোবা ভালো গবেষণা করতে চান কিন্তু শিক্ষার্থীর কাছে সেই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল কোন চাকরি নিশ্চয়তা প্রদান করবে না। বরং বিসিএস পরীক্ষা কিংবা অন্যান্য চাকরির পরীক্ষায় তার ফলাফলই তার নীতি নির্ধারণ হবে। শিক্ষকদের মোটিভ ও শিক্ষার্থীদের মোটিভ ভিন্ন থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে কোন রূপ বন্ধন তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিক্ষকদের ঘাটতি আছে সে কথা মেনে নিয়েই বলছি, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য এবং শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে এক না হবার কারণ এই বিষয়টি এক বিন্দুতে এসে মিলছে না।

২. আমি জানি একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখান ইন্সপায়ার করেন। আমি সত্যি জানিনা, আমার এই ১৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কত জন মানুষকে আমি স্বপ্ন দেখাতে পেরেছি। কখনো চেষ্টা করেছি কখনো পারিনি। সমস্যা হলো যখন আমার শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম ছিল, সবাইকে সময় দেয়া যেত, সবাইকে তাদের স্বপ্নের কথা বলা যেত। এখন যখন আমার ক্লাসে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী, দুইটি সেকশনে ক্লাস নিতে হয়, তখন মনে হয়, আদর্শ শিক্ষক হওয়ার চেয়ে গড়পরতা শিক্ষক হিসেবে ক্লাসের সিলেবাস টা শেষ করাটাই আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। আমার আর গ্রেট টিচার হওয়া উঠে না। আমি নিশ্চিত, এমন দিন যদি কখনো আসে যে প্রত্যেকটি ক্লাসে জন করে শিক্ষার্থী, আমরা আবার গ্রেট শিক্ষক হতে পারব। যুক্তির খাতিরে হয়তোবা বলা যাবে, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা এই সম্পর্কিত সমস্যা গুলো। ‌ কিন্তু আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়টি কেবলমাত্র শিক্ষক হিসেবে কেন আমি ব্যর্থ হচ্ছি সে জায়গাটি নিয়ে।

৩. দুর্ভাগ্যজনকভাবে শিক্ষার বাইরে ও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। ‌হয়তোবা আমরা শিক্ষকরা আমাদের সঠিক জায়গাটি ধরে রাখতে পারছি না। এটাও সত্য, শিক্ষার্থীদের জায়গা থেকেও ন্যূনতম সম্মান বোধের অভাব লক্ষ্য করছি। আমি জানি এখন আমার শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে বা অনলাইনে নিজেদের মাঝে আলোচনা করার সময় তারা আমাদের নাম ধরে ডাকেন। ‌নামের শেষে স্যার উচ্চারণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন (সকলে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়)। কেন এমন হচ্ছে? আমার মনে হয় এটির সাথে পারিবারিক একটি যোগসূত্র আছে। বর্তমান সময়ে আমাদের সন্তানদের সাথে বাবা-মা'র সম্পর্ক এবং আমাদের আমলে আমাদের সাথে আমাদের বাবা-মা সম্পর্কের অনেক ফারাক লক্ষ্য করছি। কাজী কেবলমাত্র শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নয় সামগ্রিকভাবে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি নমুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে।

৪. কয়েকটি অনুষদে শিক্ষার্থীদের জন্য কাউন্সিলর নিয়োগ করা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষক কাউন্সিলরের কাছে আসতে চান না। এটাও মেনে নিচ্ছি অনেক কাউন্সিলর শিক্ষার্থীদের সময় দেন না। ‌ কিন্তু যারা সময় দেন কিংবা সময় দিতে চান তাদের প্রতি ও শিক্ষার্থীরা সে ভরসা রাখতে পারছেনা। কবে এমন হবে, একজন শিক্ষার্থী প্রাণখুলে শিক্ষকের সাথে কথা বলতে পারবেন (২১০ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে থাকলে তাদেরকে আলাদাভাবে সময় দেয়া সম্ভব নয় কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এখানে একটি বিষয়)

শেষ কথা লিখছি। কেন গভীর রাতে এটি লিখতে উদ্বুদ্ধ হলাম। অনেক শিক্ষার্থী তাদের কষ্টের কথা লিখেছে। তাতে খেয়াল করলাম আমার সম্মানিত একজন প্রিয় শিক্ষক মরহুম প্রফেসর ডঃ নুরুদ্দিন স্যার এর সন্তান তার পক্ষ থেকে শিক্ষক দিবসে তার কোন ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এটি আমাকে ভাবাচ্ছে। আমার মনে আছে একজন শিক্ষার্থী আমাকে বলেছিলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসে শিক্ষকদের বেশি পরিমাণ প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম নেয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের বদদোয়া একটা প্রধান কারণ (শিক্ষকদের প্রতি কতটা ঘৃণা থাকলে শিক্ষার্থীরা এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন)।

তাই আমার সকল প্রাক্তন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের প্রতি, আমি দুঃখিত তোমাদের জন্য একজন আদর্শ শিক্ষক না হবার জন্য। কিন্তু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, হয়তো আমার পরিবেশ-পরিস্থিতির সঠিক হলে আমিও চেষ্টা করতাম কিংবা আমিও হতে পারতাম একজন আদর্শ শিক্ষক। নুরুদ্দিন স্যারের সন্তানের মত অনেক বছর পর কেউ যেন আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করে, তার চেয়ে জীবন দশায় সকল কি বলি, আমি একজন আদর্শ শিক্ষক না হবার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

লেখক
অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান শিকদার
ফার্মাকোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 





সম্পাদক ডাঃ মোঃ মোছাব্বির হোসেন
ঠিকানা: বাসা-১৪, রোড- ৭/১, ব্লক-এইচ, বনশ্রী, ঢাকা
মোবাইল: ০১৮২৫ ৪৭৯২৫৮
agrovisionbd24@gmail.com

© agroisionbd24.com 2019