www.agrovisionbd24.com
শিরোনাম:

জলাতঙ্ক নির্মূলে টিকা দানই মূখ্য

 এস এ    [ ৮ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার, ১১:২৮   মতামত বিভাগ]



ড. মো. মুর্শিদুল আহসান :

জলাতঙ্ক বা হাইড্রোফোবিয়া মানুষের জানা সবচেয়ে প্রাচীন রোগের (প্রায় ৪০০০ বছরের পুরোনো) একটি এবং আক্রান্ত মানুষ ও প্রাণিদেহে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে ১০০% মৃত্যু অবধারিত । জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ এ রোগটি একটি জ্যুনুটিক রোগ অর্থাৎ আক্রান্ত প্রাণী (কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, বেঁজি, বাদুর, ফেরেট বা নেউল জাতীয় প্রাণী, রেকুন) থেকে মানুষ বা উষ্ণ প্রাণিতে (গরু, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া প্রভৃতি) ছড়ায় ।

রোগটি অতি প্রাচীন হলেও আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও কোন বিশেষ চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয় নি । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO এর তথ্য অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এ পর্যন্ত ৭ জন ভাগ্যবান মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পরেও সুস্থ হতে পেরেছিলেন । জলাতঙ্কের মূল কারণ লিসা ভাইরাস গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত র‌্যাবডো বা র‍্যাবিস (Rabies) ভাইরাস, যার কারনে এ রোগকে র‍্যাবিস, লাইসা বা পাগলা রোগও বলা হয় । শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা তথা ভ্যাক্সিন (Vaccine) বা টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে জলাতঙ্ক রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। ১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই ফরাসি রসায়নবিদ ও জীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর জলাতঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কার করেন ।

জলাতঙ্ক রোগের সচেতনতা, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে এবং বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের মৃত্যু দিবস কে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ২৮ অক্টোবর ‘বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস’ হিসেবে পালন করা হয় । এই বিশেষ দিনটি পালনের উদ্দ্যশ্যই হল জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের মানুষকে এক জোট করে তোলা । এবারের ১৩ তম বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসের মূল থিম হল ‘Rabies: Vaccinate to Eliminate’ অর্থাৎ জলাতাঙ্ক নির্মূলে টিকা দানই মূখ্য ।

রোগটিকে কেন জলাতঙ্ক বলা হয় ?

জলাতঙ্ক মানুষসহ সকল উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট প্রাণির স্নায়ুতন্ত্রের একটি মারাত্মক রোগ । এই রোগে আক্রান্ত মানুষের গলবিলের পেশী বা Pharyngeal muscle এর অবশতার কারণে জল গ্রহণে অসুবিধাজনিত ভীতির সৃষ্টি হয় বলে রোগটিকে বাংলায় জলাতঙ্ক বলে । আক্রান্ত প্রাণির উন্মত্ততা, আক্রমণাত্মক ভাব, উর্দ্ধগতি, অবশতা, ফ্যারিঞ্জিয়াল প্যারালাইসিস ও মুখ দিয়ে লালা ঝরা এ রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য ।

জলাতঙ্ক রোগের বৈশ্বিক বিস্তার এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি

শুধুমাত্র এন্টার্কটিকা মহাদেশ ব্যতীত সকল মহাদেশেই এই রোগটি বিস্তার লাভ করেছে । বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতি ৯-১৫ মিনিটে একজন মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। প্রতি বছর জলাতঙ্ক রোগে প্রায় ৬০ হাজার লোক মারা যায় । এর মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের । আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৪০ ভাগ শিশু যাদের বয়স ১৫ বছরেরও কম । আর মানুষের শতকরা ৯৯ ভাগ জলাতঙ্ক রোগের ইতিহাসের সাথে কুকুরের কামড় জড়িত বলে ধরে নেয়া হয়। আমাদের দেশে প্রতিবছর কুকুর-বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্কের ঝুঁকিতে পড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রায় ২-২.৫ হাজার মানুষ মারা যায় যা ভারতের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । আর কুকুরের কামড়ে আমাদের দেশে জলাতঙ্ক হয়ে গবাদিপশু মারা যায় ১০ হাজার এরও বেশি । সরকারী হিসাব মতে দেশে প্রায় ১৬ লাখ কুকুর রয়েছে এর মধ্যে শতকরা ১ ভাগ কুকুরের জলাতঙ্ক হয়ে থাকে । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক জনিত মৃত্যুর সংখ্যা শুন্যের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে । আর বাংলাদেশ সরকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ২০২২ সালের মধ্যে জলাতঙ্ক নির্মূল করার । WHO’র মতে শতকরা ৭০ ভাগে কুকুরকে টিকা’র আওতায় নিয়ে আসতে পারলে এ রোগের স্থানান্তর চক্রটি ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব । বিশ্বের অনেক দেশই জলাতঙ্ক নির্মূলে সফলতা লাগ করেছে ।

জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের লক্ষণ

যেহেতু জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর থেকেই মানুষ ও গাবাদিপশুতে এ রোগ বেশি ছড়ায় সেহেতু জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুর চেনা অনেক জরুরী । কুকুরে সাধারণত ২ ধরনের লক্ষণ দেখা দেয় । (১) উন্মত্ত, অস্বাভাবিক ভাবভঙ্গি, উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়ানো, বিকৃত ক্ষুধা, বিকৃত আওয়াজ, শরীরে কাঁপুনি, বিনা প্ররোচনায় কামড়ানো, মুখ দিয়ে লালা ঝরা, ডাক কর্কশ হওয়া, পক্ষাঘাতে পায়ের ভারসম্য হারানো এবং অবশেষে শ্বাসকষ্টে মৃত্যু । (২) মৌন আচরণঃ নিস্তেজ হয়ে ঝিমোতে থাকা, বিকৃত স্মরে ধীরে ধীরে ডাকা, মানুষের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি, পক্ষাঘাত দেখা দেওয়া এবং সবশেষে মৃত্যু ।

জলাতঙ্ক মানুষের কুকুরের লক্ষণ

মানুষের শরীরে জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে উন্মত্ত বা পাগলামো আচরণ এবং মৌন আচরণ—এই দুই ধরনের আচরণ দেখা দিতে পারে ।

অস্বাভাবিক আচরণ: আক্রান্ত ব্যক্তির কথাবার্তা ও ভাবভঙ্গি হবে অস্বাভাবিক । সে উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়াবে, ক্ষুধামান্দ্য হবে, বিকৃত আওয়াজ করবে, বিনা প্ররোচনায় অন্যকে কামড়াতে আসবে ইত্যাদি । এছাড়াও নিম্নোক্ত লক্ষণ গুলোও প্রকাশ পায়ঃ

পানির পিপাসা খুব বেড়ে যায়, তবে পানি খেতে পারে না। পানি দেখলেই আতঙ্কিত হয়, ভয় পায়।
আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে আতঙ্ক আরো বেড়ে যায় ।
খাবার খেতে খুবই কষ্ট হয়, খেতে পারে না।
শরীরে কাঁপুনি, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ হয় । কণ্ঠস্বর কর্কশ হয় ।
মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দেয় ।
মৌন আচরণ: আক্রান্ত স্থান একটু অবশ অবশ লাগবে। শরীর নিস্তেজ হয়ে ঝিমোতে পারে।

মানুষের চোখের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি ও পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে।
প্রচলিত ভীতি এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দানে ব্যথাদায়ক পদ্ধতি সম্পর্কে এখনো মানুষের মাঝে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে ।

মানুষ বা গবাদিপশুকে কুকুরে কামড়ানোর পর করণীয়ঃ

প্রথমেই কাপড় কাচার ক্ষারযুক্ত সাবান (র‌্যাবিস ভাইরাসের সেলকে গলিয়ে ফেলে ক্ষার) দিয়ে প্রবহমান পানিতে কমপক্ষে ১৫/২০ মিনিট ক্ষতস্থান ধুতে হবে। এতে ৭০-৮০ শতাংশ জীবাণু মারা যায় ।
যেকোনো আয়োডিন/অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম লাগিয়ে কামড়ানো বা আঁচড় দেওয়ার ‘জিরো আওয়ার’-এর মধ্যে, অর্থাৎ যত দ্রুত সম্ভব টিকা দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত থাকতে হবে ।
কামড় যদি গভীর হয় বা রক্ত বের হয়, তবে ক্ষতস্থানে র‌্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিনসহ (আরআইজি) অ্যান্টির‌্যাবিস ভ্যাকসিন যত দ্রুত সম্ভব দিতে হবে । বেশি রক্তপাত হলে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে ।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুরটি মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে ।
জলাতঙ্কের টিকা গ্রহণে শতভাগ জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা যায় । দেশের জেলা সদরে অবস্থিত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের এই টিকা প্রদান করা হয় । উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে প্রাণির জন্য র‍্যাবিস টিকা পাওয়া যায়। এছাড়া মার্কেটেও কিনতে পাওয়া যায় । কামড়ানো প্রাণীর দেহে র‌্যাবিসের জীবাণু না থাকলেও টিকা নিতে কোনো অসুবিধা নেই ।
নিম্নের কাজ গুলো থেকে বিরত থাকুনঃ

ক্ষতস্থানে কোনো সেলাইন, বরফ, চিনি, লবণ ইত্যাদি ক্ষারক পদার্থ ব্যবহার করবেন না।
গুড়পড়া, বাটিপড়া, পানপড়া, চিনিপড়া, মিছরিপড়া, ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি জলাতঙ্কের হাত থেকে কাউকে বাঁচাতে পারে না । তাই এগুলো থেকে দূরে থাকুন ।
ক্ষতস্থান কখনোই অন্য কিছু দিয়ে কাটা, চোষন ও ব্যান্ডেজ করবেন না । এতে বরং ইনফেকশন হতে পারে ।
ক্ষতস্থানে বরফ, ইলেকট্রিক শক দিবেন না। হাত-পা বাঁধবেন না ।
আক্রান্ত রোগীর প্লেটের অবশিষ্ট খাবার খাবেন না । ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাবধানতার সঙ্গে ধুবেন । হাতে কাটাছেঁড়া থাকলে সেবাদানকারী আরো বেশি সতর্ক থাকবেন, কেননা ওই অংশ দিয়ে শরীরে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে ।
কুকুরকে অযথাই লাথি দেইয়া, ইচ্ছা করে ঢিল মরা থেকে বিরত থাকুন । এতে কুকুরটি বিরক্ত হয়ে কামড়াতে পারে । বেওয়ারিশ বা রাস্তার কুকুরকে কখনো বিরক্ত করবেন না ।

ড. মো. মুর্শিদুল আহসান

ন্যাশনাল কনসাল্ট্যান্ট, US-CDC অর্থায়নকৃত প্রিভেনটিং আনথ্রাক্স এন্ড রেবিস ইন বাংলাদেশ বাই ইনহেনচিং সার্ভিলেন্স এন্ড রেস্পন্স প্রজেক্ট (পিএআরবি),

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ ।

Email: murshidvet@gmail.com





সম্পাদক ডাঃ মোঃ মোছাব্বির হোসেন
ঠিকানা: বাসা-১৪, রোড- ৭/১, ব্লক-এইচ, বনশ্রী, ঢাকা
মোবাইল: ০১৮২৫ ৪৭৯২৫৮
agrovisionbd24@gmail.com

© agroisionbd24.com 2019