www.agrovisionbd24.com
শিরোনাম:

পরিবেশ বান্ধব জৈবিক পলিমার ও পলিথিন

 এস এ    [ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, বুধবার, ৭:৫৯   মতামত বিভাগ]



পলিমার’ নামটির সবার কাছে বহুল পরিচিত না হলেও এটি জীবনের নানা কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে ভাবে জড়িয়ে আছে। বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা অনুসারে, পলিমার (গ্রীক পলিম ‘অনেকগুলি’ এবং মার ‘অংশ’) হচ্ছে একটি বৃহৎ অণু বা ম্যাক্রো মোলিকুল, যা অ্যালকাইন ও অন্যান্য প্রতিস্থাপিত অ্যালকিন সমূহ উচ্চচাপ, উচ্চতাপ ও অনুঘটকের উপস্থিতিতে এক অণু অপর অণুর সাথে পরপর যুক্ত হয়ে গঠিত হয়। ক্যারি ব্যাগ থেকে ওষুধের বোতল, খাদ্য পরিবেশনের পাত্র থেকে ফুলের টব- বিভিন্ন ক্ষেত্রে চটের ব্যাগ হোক কিংবা কাঁচের শিশি অথবা চিনামাটির থালা কিংবা মাটির টব-এ সবকিছুর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পলিমার।উল্লেখযোগ্য দুটি পলিমার হলো প্লাষ্টিক ও পলিথিন।

১৯০৭ সালে প্লাস্টিকের আবিষ্কারকে বেশ সানন্দেই স্বাগত জানিয়েছিল বিশ্ববাসী। ৫০ থেকে ৭০ এর দশকে সীমিত পরিমাণ প্লাস্টিক উৎপাদিত হওয়ার দরূন নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে চিন্তাধারা তখন ছিল ভাবনার বাহিরে। কিন্তু ৯০ এর দশকে প্লাস্টিকের উৎপাদন এবং এর দ্বারা সৃষ্ট বর্জ্যের পরিমাণ তিনগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। এবং ২০০০ সালের পর থেকে এই দূষণ পুরোপুরি ধরা ছোয়ার বাইরে চলে যায়। অপেক্ষাকৃত সস্তা, বহনযোগ্য এবং রাসায়নিকভাবে উচ্চ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল পলিমারের তৈরী এসব সামগ্রী। অপরদিকে, মনুষ্য কর্তৃক উদ্ভাবনী আবিষ্কার ‘পলিথিন’, যা ও এক প্রকার পলিমার এবং একইসাথে অত্যন্ত পরিচিত প্লাষ্টিক। উচ্চ চাপ (১০০০-১২০০ atm) ও তাপমাত্রায় (২০০c) সামান্য অক্সিজেনের উপস্থিতিতে তরলীভূত হয়ে অসংখ্য ইথিলিনের অণু (৬০০-১০০০, মতান্তরে ৪০০-২০০০ অণু) পলিমারাইজেশন প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত হয়ে পলিথিন উৎপন্ন করে। পলিথিন সাদা, অস্বচ্ছ, নমনীয় পদার্থ।

দৈনন্দিন কাজে প্লাস্টিক ও পলিথিন এর ব্যবহার আমাদের কাজকে অবশ্যই সহজ করেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই আবিষ্কার আমাদের জন্যই অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন প্রকৃতিতে দীর্ঘদিন অবিকৃত থাকে, পচে না এমনকি প্রকৃতিতে বিরাজমান ব্যাকটেরিয়া এবং ফাংগাস দ্বারা বিয়োজিত হয় না। মূলত, সচেতনতার অভাবে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে ব্যবহারকারীরা এসব সামগ্রীগুলোকে বর্জ্য পদার্থ হিসেবে যত্র তত্র ফেলে দেয়। নর্দমাগুলো এসব  সামগ্রী গুলো দিয়ে ভরে যাওয়ার দরুন নোংরা পানি এবং বস্তুগুলো নিষ্কাসিত হতে পারেনা। পরিনামে আশেপাশের এলাকাগুলো নোংরা পানিতে প্লাবিত হচ্ছে যা পানীয় জলের উৎসগুলোতে মিশে গিয়ে পানি দূষণ ঘটাচ্ছে। এছাড়া  নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহৃত দ্রব্যের মোড়কে প্লাষ্টিক ও পলিথিন ব্যবহার করায় তা হতে বিষ ফেনোল নামক বিষ নির্গত হচ্ছে যা খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মিশে যায়, কারণ বশত খাদ্য গুণাগুণ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমন জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে। বদ্ধ ও নোংরা জলে মশা-মাছিসহ নানা ধরনের ক্ষতিকারক কীটের দ্রুত বংশ বৃদ্ধি ঘটছে এই সব কিট মশা মাছি দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি করছে যেমনঃ ম্যালেরিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, কলেরা। এসকল কারণে পশুপাখি ও মারাত্মক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে এবং অকালে মৃত্যুবরণ করছে। এছাড়া জলাশয়ে ফেলে দেওয়া এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন অবিকৃত অবস্থায় জলাশয় জমা হয় যার ফলে মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। অনেক সময় প্লাষ্টিক ও পলিথিন পোড়াতে দেখা যায়, যা বায়ুদূষণ ঘটায়। এছাড়া, এসব বর্জ্যগুলো মাটিতে থাকার দরুন মাটি তার মৌলিকত্ব হারাচ্ছে। শুধু তাই নয়, মাটির নিচে জমে থাকা প্লাস্টিক ও পলিথিনের দরুন উদ্ভিদ সহজভাবে মাটি থেকে জলীয় খাদ্যগ্রহণ করতে পারে না, ফলে কৃষিকাজেও স্বাভাবিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়। এসব অব্যবহৃত পলিমার সামগ্রী পরিবেশে বিয়োজিত হতে অনেক সময় নেওয়ায় বিষাক্ত পদার্থ নিঃসরণের সম্ভাবনা থেকেই যায়, যার দরুন গ্রীনহাউস নামক গ্যাসের নিঃসরণ হয় যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মত ভয়ঙ্কর ঘটনাকে ত্বরান্বিত করে।

পৃথিবী আজ যখন প্লাষ্টিক ও পলিথিন দূষণের চরম সীমায় এসে উপনীত হয়েছে, ঠিক তখনই ‘এর সমতুল্য, কিন্তু ক্ষতিকারক নয়- এমন কিছু আবিষ্কার করলে ক্ষতির মোকাবেলা করা সম্ভব হবে’- এই ধারণা মাথায় রেখে আবিষ্কার হলো জৈবিক পলিমার।

জৈবিক পলিমার কী?

জৈবিক পলিমার হলো এমন এক ধরনের পলিমার যা মূলত জৈব উপাদান থেকে তৈরী। জৈবিক পলিমারের দুটি উল্লেখযোগ্য রূপ হলো জৈবিক প্লাস্টিক ও পলিথিন। প্রথমে জেনে নেওয়া যাক, জৈবিক প্লাস্টিক সম্পর্কে। বাজারে যেসব পলিমার তথা প্লাস্টিক পাওয়া যায় তার কাঁচামাল হিসেবে মূলত ব্যবহৃত হয় পেট্রোলিয়াম জাতীয় হাইড্রোকার্বন অর্থাৎ এটি মূলত খনিজ তেল নির্ভর। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা যে জৈব প্লাস্টিক শিল্পের ধারণা প্রদান করেছেন তার কাচামাল মূলত কৃষি বা উদ্ভিদ জাতীয় বস্তু যা পরিবেশে দ্রুত বিয়োজিত হয়ে যাবে এবং যার ফল স্বরুপ এটিকে পরিবেশবান্ধব বলে আখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যেহেতু উদ্ভিদ বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে বৃদ্ধি পায় সেহেতু জৈব প্লাস্টিকের দহনে উৎপন্ন কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করবে না। তাই বিজ্ঞানীরা আগামীর সবুজ পৃথিবীর জন্য বেছে নিচ্ছে জৈবিক পলিমার তথা জৈবিক প্লাস্টিককে।

জৈবিক প্লাস্টিক হলো নতুন প্রজন্মের প্লাস্টিক যা তৈরি করতে মূলত ব্যবহৃত হয় সেলুলোজ, আখ, ভুট্টা, ট্যাপিওকা, আলু, সয়াপ্রোটিন, ল্যাকটিক এসিড ইত্যাদি থেকে। এছাড়া বিভিন্ন গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বলা হচ্ছে যে, এভোক্যাডো, সিউইডস, ক্যাকটাস, আঙ্গুর, মাশরুম এছাড়া বিভিন্ন পোকামাকড় হতে জৈব প্লাস্টিক উৎপন্ন করা সম্ভব হবে। পেট্রোলিয়াম এর পরিবর্তে এসব জৈব উপাদান ব্যবহারের সুবিধা হল, এদের সহজলভ্যতা এবং পুনর্ব্যবহার যোগ্যতা। জৈব প্লাস্টিক পরিত্যক্ত অবস্থায় ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক প্রভৃতি আণুবীক্ষণিক জীবের দ্বারা আক্রান্ত হয় যা সহজেই কার্বন-ডাই-অক্সাইড, পানিও জৈব পদার্থে পরিনিত হয় যা সার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ প্লাস্টিক পরিবেশ বান্ধব হওয়ার কারণেই, প্লাস্টিক শিল্প এখন নতুন দিকে মোড় নিয়েছে।বর্তমানে জৈবপ্লাস্টিক শুধু ব্যাগ নয়, কৃত্রিম তন্তু, চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যবহৃত বস্তু, আসবাবপত্র, বাড়িঘর নির্মাণে ব্যবহৃত বস্তু তৈরিতে ও জৈবিক প্লাস্টিকের ভূমিকা অনবদ্য। এমনকি ২০১৪ পর্যন্ত, বায়োপ্লাস্টিকগুলি বিশ্বব্যাপী পলিমার বাজারের প্রায় ০.২% (৩০০ মিলিয়নটন) উপস্থাপন করেছে।


অনেক উন্নত দেশেই উদ্ভিদ ও উদ্ভিদ জাত বস্তু হতে যেমন বাশ তন্তু, দানা শস্যের তুস, আঠা প্রভৃতিকে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন বায়োপ্লাস্টিকে পরিবর্তিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে যা হবে সুলভ এবং ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা যুক্ত। সমগ্র বিশ্বে জাপানের টয়োটা মোটর কর্পোরেশন প্রথম জৈব প্লাস্টিক ব্যবহারের কৃতিত্বের দাবিদার। তাদের ‘রম’ নামক মডেলের গাড়ির চাকা হিসেবে যে জৈব প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয় তা মূলত আলু এবং আখ হতে প্রস্তুত। জাপানের মিৎসু বিশি কোম্পানি উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল এবং বেশি কাঠিন্যযুক্ত জৈব প্লাস্টিকের উৎপাদন করছে যা সনি কর্পোরেশন তাদের কিছু ওয়াকম্যান তৈরিতে ব্যবহার করছে। আশা করা যায় এই ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণা আধুনিক প্রযুক্তি অধিগ্রহণের ফলে জৈব প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে আর আমরা এগিয়ে যেতে পারবো সবুজ পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে, আরো দ্রুত।

এবার আসা যাক সময়ের উদ্ভাবনী আবিষ্কার, জৈবিক পলিথিনে। সোনালীব্যাগ হলো পাট থেকে উদ্ভাবিত এমন এক ধরনের জৈবিক পলিথিন ব্যাগ। পাট থেকে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের এই প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী মোবারক আহমদ খান। পাট থেকে সেলুলোজ সিটের মাধ্যমে পলিথিন ব্যাগ তৈরি করা হয়। পাটের তৈরি এ সোনালী ব্যাগ সহজেই মাটির সাথে মিশে যায় এবং মাটিতে উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সম্প্রতি এমন আরও এক পলিথিন ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়েছে, যা পানিতে দ্রবীভূত হয়ে যাবে। তাছাড়া মিশে যাওয়ার পরও তা কোনো বিষাক্ত পদার্থের সৃষ্টি করবেনা কিংবা কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। যুগান্তকারী এই প্লাস্টিক ব্যাগের নাম হলো ‘সল্যুব্যাগ’। পরিবেশ দূষণ প্রতিহত করার তাগিদে চিলির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রাজধানী সান্তিয়াগোর দুইজন গবেষক এই সল্যুব্যাগ তৈরি করেন। এরা হলেন- রবার্টো অ্যাস্তেত এবং ক্রিশ্চিয়ান অলিভারস। দীর্ঘ চার বছরের গবেষণার পর তারা এ ব্যাগ আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন জৈব উপাদানের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হচ্ছে বলে এ ব্যাগ পরিবেশ-বান্ধব। এই মূল উপাদানটির নাম হলো পলিভিনাইল অ্যালকোহল (পিভিএ)। এই পলিভিনাইল অ্যালকোহল পরিবেশ এবং প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হওয়ার কারণ হলো এটি দ্রবীভূত হওয়ার পর শুধুমাত্র কার্বন থাকে, যা কোনো প্রকার নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনা। মূলত প্লাস্টিকের তেলজাতীয় উপাদানকে সরিয়ে দিয়ে পানিতে দ্রবণীয় উপাদানের সংযোগ ঘটানো হয় বলেই এটি মোটেও বিষাক্ত নয়। সল্যুব্যাগ সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট সময় নেয় পানির সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এটি এর বিশেষ একটি সুবিধা। আর এই পদার্থ পানিতে মিশলেও ঐ পানি পান করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকেনা। রবার্টোরমতে, তাদের উদ্দেশ্যই ছিল এমন কোনো জিনিস তৈরি করা,  যা পরিবেশকে দূষিত করবেনা। তাই তারা এই ব্যাগ তৈরিতে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করেন।

পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সুসমন্বিত রূপই হলো সুস্থ পরিবেশ। এ সুসমন্বিত রূপের ব্যত্যয় ঘটলে পরিবেশ দূষণ হয় এবং পরিবেশের স্বাভাবিক মাত্রার অবক্ষয় দেখা দেয়। ক্ষতিকর এসব প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্প হিসেবে জৈবিক পলিমার এবং পলিথিন এর ব্যবহার এখন সময়ের চাহিদা। গণমাধ্যম এগিয়ে আসলেই কেবল বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে এর গুরুত্ব বোঝানো সম্ভবপর হবে।

জান্নাতুল মাওয়া

শিক্ষার্থী

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইণ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।

224lamia@gmail.com





সম্পাদক ডাঃ মোঃ মোছাব্বির হোসেন
ঠিকানা: বাসা-১৪, রোড- ৭/১, ব্লক-এইচ, বনশ্রী, ঢাকা
মোবাইল: ০১৮২৫ ৪৭৯২৫৮
agrovisionbd24@gmail.com

© agroisionbd24.com 2019