www.agrovisionbd24.com
শিরোনাম:

করোনা মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা খাদ্যকে আরো মৌলিক করেছে

 Desk News    [ ১৬ জুন ২০২০, মঙ্গলবার, ৪:৩৫   মতামত বিভাগ]



করোনা মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা খাদ্যকে আরো মৌলিক করেছে
১৯২০ সনের পর মহামারীর কারনে এত বড় জীবনহানি বিশ্ব আর দেখেনি। এর পরিনতি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বিচলিত হলেও গবেষকরা বলছেন অর্থনীতির ক্ষতির চাইতে মানব সভ্যতা প্রথমে রক্ষা করাই বড় কথা। কৃষির উৎপাদন ব্যতিত পুরো অর্থনীতি আজ অবরুদ্ধ। জাতিসংঘের মহাসচিব করোনাকে (কোভিড-১৯) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচাইতে বড় বৈশ্বিক ও মানবিক সংকট হিসেবে বর্ননা করেছে। তাবৎ বিশ্ব এই একই সমস্যায় আক্রান্ত। অর্থ, ক্ষমতা তুচ্ছ হয়ে গেছে। মানুষ তার প্রাচীন সভ্যতা তথা কৃষিতে ফেরত যাবার প্রয়োজনীয়তা অনুভুত হচ্ছে।

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার প্রথমটি খাবার। প্রথমে মানুষ বাঁচবে তার পর মানুষ সভ্য হবে, সংস্কৃতি বুঝবে। করোনা এই ১ম মৌলিক চাহিদাকে আরো মৌলিক করেছে। আপনার অনেক টাকা আছে কিন্ত খাবার জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল তাহলেই আপনি শেষ। আপনার টাকা কোন কাজে দিবে না, কারন আপনাকে কেউ খাবার দিবে না বা কারো নিকট হতে খাবার আনার মত অবস্থায় আপনি নেই। এই অভিজ্ঞতা এটাই আমাদের প্রথম নয়। ২০০৮ সনে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সমস্যার সময় আমরা টাকা দিয়েও বিভিন্ন জায়গা হতে প্রত্যাখাত হয়েছি। সবাই হতাশ করেছে। এর বিপরীতে আমাদের রয়েছে ১৬ কোটির বিশাল জনসংখ্যা প্রতি বর্গ কিঃমিঃ বসবাস করে ১,১৪৬ জন। নির্দিষ্ট কিছু কৃষি সামগ্রী বাদে আমাদের কৃষি অনেক সমৃদ্ধ। আমরা আমাদের প্রধান খাদ্য ধানে স্বয়ংসম্পূর্ন। ২০১৮-১৯ সালে ২.৪ কোটি টন বোরো, ১.৫৩ কোটি টন আমন এবং ২৯.২ লক্ষ টন আউশ উৎপাদিত হয়েছে। এই উৎপাদন ধারা অব্যহত থাকলে সমস্যা নেই কিন্ত প্রাকৃতিক দূর্যোগ, এর প্রক্রিয়াজাতকরন, বাজারমূল্য নিশ্চিত না করতে পারলে কৃষক এ হতে দুরে সরে যাবে। এছাড়া সবজি উৎপাদনে আমরা স্বয়ং সম্পূর্ন ২০১৮-১৯ সালে ৪ কোটি ৩২ লক্ষ টন সবজি উৎপাদন করেছি। আমাদের সমস্যা হচ্ছে গম, ডাল এবং তৈলবীজ জাতীয় ফসলে আমরা আমদানি নির্ভর। কিন্ত এই মৌসুমে দেশে যে পরিমান ভুট্টা, তামাক চাষাবাদ করা হয় তা সমুলে উৎপাটন করতে পারলে এ চাহিদাও পুরন করা সম্ভব।

বাংলাদেশের অর্থনীতির তিনটি বড় উপখাত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত। কৃষির উপখাতগুলো হচ্ছে। শস্য উৎপাদন, প্রাণিসম্পদ, মৎস্যসম্পদ। করোনাকালে এসব উপখাতের সম্পূর্ন বন্ধ না হলেও মূল্যের নিম্নমূখী প্রভাবের কারনে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বা হচ্ছে। বাংলাদেশে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে আলোচনা চললেও চুলচেরা বিশ্লেষন করে তার প্রভাব নিরুপণ করা হয়নি।

করোনা ভাইরাসের কারনে দেশের ১ কোটি ৬৫ লক্ষ ৬২ হাজার ৯৭৪ টি কৃষি পরিবার হুমকির মুখে। এর মধ্যে গ্রামে রয়েছে ১,৫৯,৪৫,১১৯ টি পরিবার আর শহরে রয়েছে ১৭,৮৫৫ টি পরিবার। তবে বিবিএস-এর তথ্যমতে পশুপালন ও মৎস্য চাষকে বিবেচনায় এনে দেশে মোট কৃষি পরিবার ৩,৫৫,৩৩,১৮০ টি এর মধ্যে ধান ফসলে সাথে জড়িত ১,৬৫,৬২,৯৭৪ টি আর মৎস্য চাষের সাথে জড়িত ৯,৯৫,১৩৫ টি পরিবার। জিডিপির ১৫% অবদান রাখে এই কৃষি। এখনো দেশের ৪০.৬০% লোক কৃষিকে পেশা হিসেবে বহন করে চলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বলেন, ‘এখন যেহেতু বিশ্বব্যাপি একটি বিশেষ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেই কারনে বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো দক্ষ হতে হবে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় খাদ্য উৎপাদন এবং মজুদে হয়তো সমস্যা নেই, কিন্ত করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থাপনাটাই বড় চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাড়াবে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাফল্য নির্ভর করবে বাজার ব্যবস্থাপনা ত্রুটিমুক্ত থাকার উপর। এক্ষেত্রে কুষিপণ্যের মূল্য ও মজুদ নিয়ে কারসাজি, অন্যায়ভাবে বাজারকে প্রভাবিত করা, কৃত্রিম সংকট তৈরী-এ ধরনের অব্যবস্থাপনা যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।’

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন ‘এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খাদ্য সরবরাহ চেইন সচল রাখা। কেননা লক ডাউনের কারনে কৃষি উন্নয়ন ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ফলে শুধু সবজি নয়, মৎস্য, পশুপালন, কৃষির সব উপখাতেই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অভিঘাত এসেছে’

প্রথমেই বলেছি কৃষি শুধু আদি পেশা নয় বাঁচার সভ্যতা। আপনি খেতে না পারলে আপনার কোন উন্নয়ন কাজে লাগবে না। আপনি অনেক উন্নত কিন্ত আপনার নিজস্ব উৎপাদন নেই আপনি সেই ইট, পাথরের মধ্যে পড়ে মরবেন। তাই বিশাল জনসংখ্যার এই দেশকে বাঁচাতে হলে কৃষিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। কৃষি আমাদের মুল শক্তি। আমাদের বিশাল জনসংখ্যার সাথে রয়েছে সমৃদ্ধ এক কৃষির সম্ভবনা। তাই এই কৃষির জন্য দরকার একটি কার্যকর, বাস্তববাদী ও বাস্তবায়নমূখী পরিকল্পনা।

স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনাঃ

প্রণোদনাঃ সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়েছে। বেশিরভাগ প্রণোদনা ফেরত দিতে হবে স্বল্প সুদে। কিন্ত যার বাঁচার সামর্থ্য নাই তার আবার ফেরত দেবার ক্ষমতা। কৃষক আমাদের মুখে খাবার তুলে দেয় তাই তাদের মুখে এই মূহুর্তে খাবার তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। এই খাবার তোলা ২ কেজি চাল আর ১ কেজি আলু নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিকট সুস্পষ্ট ডাটাবেজ থাকবে তার প্রকৃত কৃষক কয়জন তাদের আর্থিক অবস্থার প্যারামিটার। ক্ষতির পরিমান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নখদর্পনে থাকবে। সম্প্রতি আমি নবীন অনেক কৃষি কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি তারা প্রচুর কৃষি সম্পৃক্ত, তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানও অনেক ভালো। তাদেরকে শুধু সঠিক নির্দেশনা দিতে হবে। তাদের মূল্যায়ন ও সুযোগ দিতে হবে। আপনি যদি তাদের সঠিক নির্দেশনা দেন তারা চমৎকার কৃষি তথ্য ভান্ডার দিতে পারে।
বীজ সরবরাহঃ এনজিওরা কৃষকের সমস্যাকে পুঁজি করে ব্যবসা করে। এটা স্পষ্ট ও প্রমানিত। এক্ষেত্রে প্রথমে এদের মধ্যে মানবিকতাবোধককে জাগ্রত করতে হবে। তাদের উন্নয়ন ফান্ড হতে সাময়িক এই সময়কালে বিনে পয়সায় বীজ সরবরাহহের শর্ত দিতে হবে। বিএডিসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সার এর ক্ষেত্রে শর্তযুক্ত প্রণোদনা বা স্বল্পসুদে প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আরেকটি বিষয়, আমদানি নির্ভর বীজ এর পরিবর্তে দেশীয় বীজ ব্যবহারের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। আমদানীর মুল সমস্যা এগুলো হাইব্রিড এখান থেকে বীজ হয় না। দ্বিতীয়ত আপনি সমস্যায় পড়লে কেউ আপনাকে আর বীজ দিয়ে সহযোগিতা করবে না। তাই ইনব্রিড উন্নয়নে ব্যর্থতায় ইতোমধ্যে আপনি নিজের প্রজাতি হারিয়ে অসময়ে না খেয়ে থাকবেন। বিষয়টি নিয়ে কৃষি সংশ্লিষ্টদের দ্রুত চিন্তা করা দরকার। হাইব্রিডের অত্যাচারে ধান ও কৃষি গবেষণা হুমকির মুখে পড়েছে। তারা গবেষণা হতে দুরে চলে আসছে।
চাহিদা যোগান নয় প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত মার্কেট ব্যবস্থাপনাঃ চাহিদা-যোগানের উপর বাজার ব্যবস্থা নির্ভরশীল। কিন্ত এর পরও যাতে ফটকা কারবারী, স্বার্থান্বেষী মহল এটার সুযোগ লাভ না করে তার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অর্থ বাজারেও (Money market) সরকার নিয়স্ত্রন করে। মানুষ না খেয়ে থাকতে পারে না। সুতরাং কোন সময় মার্কেটে পন্যের মূল্য শূন্য হতে পারে না। কিন্ত অদৃশ্য কারনে তা হয়ে যায়। সরকারকে এর যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকার ধানের ক্ষেত্রে শুধু নিয়ন্ত্রিত মার্কেট পরিচালনা করে। এখন শুধু ধান নয় হর্টিকালচার শস্য, পশুপালন বা মৎস্য চাষ সবক্ষেত্রে আমরা স্বয়ং সম্পূর্নতা অর্জন করেছি। কৃষকেরা এসব কাজে তাদের শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে। জাপান স্থানীয় আঠালো যে চাল খায় তা আমদানী করলে অনেক কম দাম পড়ে তার পরও তারা উৎপদন করে এবং সরকার তা বেশি দামে কৃষকদের নিকট হতে কেনে। আমদানীতে বাঁধা দিয়ে রেখেছে। কারন কৃষককে বাাঁচাতে হবে। তারা এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা বুঝেছে টিকে থাকতে হলে নিজের সক্ষমতার কোন বিকল্প নেই।
স্থানীয় বাজার প্রতিষ্ঠাঃ সব পন্যের একটা স্থানীয় বাজার থাকলেও কৃষি পন্যের ক্ষেত্রে কিছু চিন্থিত ফটকা কারবারী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বাজার ছাড়া কৃষকের কোন কার্যকর বাজার নেই। ফলে কৃষকের ভাগ্য নিয়ন্ত্রা সেই ফটকা কারবারীরাই। দ্রুততম সময়ে নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় বাজার সৃষ্টি করতে হবে। সুবিধাভোগী ফটকা কারবারীকে পিছনে ফেলে করোনাকালীন সময়ে কিছু ভালো কৃষি বিপনণ কারী প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়েছে তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ এর পুরো তত্ত্বাবধায়ন করবে।

মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনাঃ
বিপনণ ব্যবস্থার উন্নয়নঃ ১ টাকা পিস পাতাকপি বিক্রি করতে না পেরে কৃষক পাতাকপি রাস্তায় ফেলে দিয়েছে কিন্ত আপনি কি কোন সময় ২০ টাকার নীচে কোন পাতাকপি বাজার থেকে কিনতে পেরেছেন? তাহলে সমস্যা কোথায়? মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমাতে হবে। এখানে রয়েছে একটা বড় চক্র। সম্প্রতি করোনার কারনে মার্কেট চেইনে এক প্রকার মধ্যস্বত্বভোগীরা এসেছে যারা কৃষক হতে সরাসরি কনজিউমারের কাছে প্রোডাক্ট পৌঁছে দিচ্ছে। এদেরকে প্রমোট করতে হবে।
শতভাগ জমির ব্যবহারঃ বাংলাদেশের মাটি অনেক উর্বর। কোন ফসল একটু যত্ন করলেই হয়। সুতরাং কোন জমি ফেলে রাখা যাবে না। একটি বাড়ী একটি খামার বা যে কোন স্লোগানেই আসি না কেন শতভাগ জমি ব্যবহারে সচেষ্ট হতে হবে। আপনি খাবারের পিছনে অতিরিক্ত বিনিয়োগের পরিমান কমাতে হবে। সম্প্রতি কুষ্টিয়া একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। জেলা প্রশাসক জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও সহকারী ভুমি কর্মকর্তাদের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে “যে সমস্ত ভূমি মালিকগন তাদের জমি অনাবাদী/পতিত ফেলে রেখেছেন তাদের জমি ১৯৫০ সনের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাস্বত্ত আইনের ৯২ ধারা মোতাবেক ১ নং খাস খতিয়ান ভুক্ত করার আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।”
বাস্তবসম্মত কৃষি পরিকল্পনা প্রনয়নঃ বাংলাদেশে বাস্তবসম্মত কৃষি পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। এখানকার কৃষি পরিকল্পনা কৃষকের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কৃষক কোন কিছু লাভবান মনে করলো তাই চাষ করে। এর পর কৃষি বিভাগের উপসহকারী কর্মকর্তারা ডাটা এনে একটা রিপোর্ট করে। এটা আদৌ কোন কৃষি পরিকল্পনা নয়। সরকারকে তার বছরের চাহিদা নিরুপন করে তা অভ্যন্তরীন উৎস হতে পুরনের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। রবি মৌসুমে গম আবাদ না করে লক্ষ লক্ষ একর জমি ভুট্টা ও তামাক চাষ করছে এ ব্যাপারে সরকারের কোন পরিকল্পনা নাই। কৃষক অর্থ চায়, বাঁচতে চায় তাই সে ভুট্টা বা তামাক আবাদ করছে কিন্ত গম বা সরিষা আবাদের কোন কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহন করছে না। দীর্ঘস্থায়ী কৃষি বা খাদ্য নিরাপত্তার কথা চিন্তা করলে আপনাকে প্রথমে বাঁচার পরিকল্পনা নিতে হবে। তার পর আপনাকে অন্যান্য কিছু করতে হবে।
ডাল ও তৈলবীজ জাতীয় ফসল চাষাবাদঃ আমরা দেখেছি ধান এবং সবজি আমাদের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা রয়েছে কিন্ত ডাল ও ভোজ্য তেলে আমরা আমদানি নির্ভর। আমাদের এই আমদানির গন্ডি হতে বের হয়ে কৃষিতে শতভাগ অভ্যন্তরীন চাহিদা পুরন করতে হবে।
মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তিবিদ নিয়োগঃ আমাদের কৃষি ক্ষেত্রে এখনো অভিজ্ঞতা ভিত্তিক চলমান। প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই শ্লথ। এর একটা কারন এও যে মাঠ পর্যায়ে কৃষির উপর প্রযুক্তিজ্ঞান নির্ভর পর্যাপ্ত জনবল না থাকা। দেশের জনগনকে বাঁচাতে হলে এই খাতে সনাতন প্রযুক্তি আর জ্ঞান দিয়ে সম্ভব নয়। দ্রুত মাঠ পর্যায়ে কৃষির জ্ঞান সম্পন্ন প্রচুর জনশক্তি নিয়োগ করে তাদের জনসংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কৃষি বিভাগকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাঃ

কৃষি যান্ত্রীকিকরণ: এখন আপনি যেভাবেই বর্ননা করেন আর হাতে কেটে, আর মাথায় বহন করে ফসল ফলানো সম্ভব নয়। ১৯৬১ সনে আইয়্যুব প্রথম কৃষি যান্ত্রীকরনের জন্য উদ্যোগ গ্রহন করেন কিন্ত দেশ স্বাধীন হয়ে অর্ধ শতাব্দি পার করে ফেললেও আমরা এটা নিয়ে কার্যকরভাবে কোন কাজ করিনি। কোন একটা কারনে শ্রমিক সংকট হলে বিভিন্ন দলীয় ব্যানারে ধান কাটার দৃশ্য নির্লজ্জভাবে আমরা শিক্ষিত সমাজ নাটক করি আর মিডিয়া দেখায়। এবার করোনা আরো বেশি হাসিয়েছে। কেউ কাঁচা ধান কেটে আরো ১০ বিঘা ধান নষ্ট করেছে। কেউ ৫০০ গ্রামের ধানের আটি মাথায় নিয়ে ছবি তুলেছে, কেউ জুতা পরে, সানগ্লাস পরেই শুটিং এ নেমেছে। কিন্ত এখানে দাড়ানো সবাই ১ হাজার করে টাকা দিলে এই এলাকায় একটা কম্বাইন্ড হার্ভেস্টর হতে পারতো। এটা হতো কার্যকরী ও স্থায়ী সমাধান। কিংবা যারা শুটিং করেছে তারা নিজেরাও একাই একটা হার্ভেস্টর কিনে দেবার সক্ষমতা রাখে। এলাকা ভিত্তিক এই ধরনের মেশিনারিজ ক্রয়ের জন্য সমিতি করা যেতে পারে যেখানে যৌথভাবে টাকা সংগ্রহ করে এমন মেকানাইজেশন করা হবে। এই সমিতি এটা ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষন করবে। কৃষিতে সমৃদ্ধির প্রথম কথা যান্ত্রিকীকরন।
শস্য বীমাঃ কৃষককে বাঁচতে দিতে হবে। কৃষক মরে গেলে আপনার জন্য চাষাবাদ কে করবে? বাংলাদেশে কৃষি বিমুখ হবার জন্য এটাও একটা কারন যে কৃষককে নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। হয়তো কেউ বক্তব্যের মাঠে দু চারবার বলে কিন্ত কোন কার্যকরী প্রক্রিয়া নেই। আর এ কারনে কৃষক তার বিকল্প আয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আপনি যদি কুষ্টিয়া, রংপুর যান দেখবেন লক্ষ লক্ষ একর জমি তামাক চাষ হয়, কেন? কারন কোম্পানি তার তামাক সংক্রান্ত বিষয়ের ইনপুট সাপ্লাই দেয়। কেনার নিশ্চয়তা দেয়। তাহলে কেন চাষাবাদ করবে না? বিশ্বব্যাপি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষির ব্যাপক পরিবর্তন শুধু নয় হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে নিয়মিত। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দেশে ৩.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমি প্রতিবছর খরায় অক্রান্ত হয়। হাওড় অঞ্চলে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ দেবার কারনে নদীর কাছাকাছি এলাকার জমিতে পলি পড়ে উঁচু হয়েছে কিন্ত বাঁধের ভেতরে বেসিনের মত নিচু হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। এই রকম জলাবদ্ধ জমির পরিমান প্রায় ১ লক্ষ হেক্টর। বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে ৪০ বছরে লবনাক্ত জমির পরিমান ২৭% বেড়েছে। নদীর নাব্যতা কমার কারনে লবনাক্ত পানি সমুদ্র হতে নদীতে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে লবনাক্ত জমির পরিমান ১ মিলিয়ন হেক্টরেরও বেশি। অনিয়মিত ও অকাল বৃষ্টি এখন নিয়মিত হবার কারনে শত শত হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। হাওড় অঞ্চল বিশেষত সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ও মৌলভীবাজারে প্রতিবছর কোন না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিত্যসঙ্গী হয়েছে। এ অঞ্চলে কৃষির প্রতি অনিহা ইতিমধ্যে একটা স্পষ্ট লক্ষণ প্রকাশ শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয় কৃষকরা মুক্তি পেলেও দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে। কৃষি বা শস্য বীমা কৃষির উপর নির্ভরশীল জনগোষ্টির জন্য একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। বছরের বিভিন্ন সময়ে খরা, বন্যা, শিলাবৃষ্টি ভুমিকম্প, ঘুর্নিঝড় এ কারনে কৃষির যে বিপর্যয় হয় কৃষি বা শস্য বীমার মাধ্যমে তার এই অনিশ্চয়তার ঝুঁকিকে কমাতে হবে। বাজেটে এ সংক্রান্ত বরাদ্দ দেবার জন্য বলার মত কেউ নেই। এ ব্যাপারে বিদেশী দাতা সংস্থার কাছে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা পেশ করতে হবে। আমাদের দেশের যে সমস্ত উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে তাদের এ ব্যাপারে সক্রীয় অংশ গ্রহন নিশ্চিত করতে হবে। যত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় উন্নয়ন সংস্থার আর্থিক অবস্থা ভালো হয় আর কৃষক ধ্বংস হয়।
কার্যকর রপ্তানি পরিকল্পনা গ্রহনঃ দেশে সব পন্যের শতভাগ ভোগ গ্রহন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে ব্যাপক রপ্তানি সম্ভবনা রয়েছে। রপ্তানি বানিজ্য পরিচালনার জন্য কৃষি সম্প্রসারনের আইনগত কাঠামোয় কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে। সরকারের সেক্টর অনুযায়ী সোর্স নির্ধারন করে নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক রপ্তানির প্রয়োজনীয় সুবিধা দিতে হবে।
কৃষি চাহিদা পরিকল্পনা গ্রহনঃ প্রথমেই বলেছি মানব সভ্যতা রক্ষা হচ্ছে মানুষের প্রথম কাজ। মানুষের প্রথম মৌলিক চাহিদা খাবার। জনসংখ্যার স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির সাথে খাবারের প্রয়োজনীয়তা বা চাহিদা নিরুপন করা হয়। এটা খুব একটা সাদামাটা কাজ। কোভিড-১৯ আমাদের সেই চাহিদা নিরুপনকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। আমাদের বাঁচতে হবে সেই বাঁচার জন্য আমাদের তামাক সেবন নয় আমাদের দরকার মসুরি, সরিষা, গম তাহলে টাকার জন্য আমাদের বিষপান দরকার নেই। বিদ্যমান সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করে কৃষি পরিকল্পনাবিদদের আরো কার্যকরী পরিকল্পনা নিতে হবে। ৫ বা ১০ বছর মেয়াদী কার্যকর কৃষি পরিকল্পনা থাকতে হবে যা বাৎসরিক মূল্যায়ন এর মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।
কৃষি জমি ধ্বংস করে অবকাঠামো করা যাবে নাঃ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশে এই বিষয়টা কিছুটা আটকে আছে। কিন্ত বিষয়টা আইনানুগভাবে আসতে হবে। সরকার এখন গ্রামেও বহুতল বাড়ী নির্মানের পারমিশন দিচ্ছে। প্রতিদিন ২২০ হেক্টর হিসেবে বছরে ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি হারিয়ে যাচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও আবাসনের জন্য।
আমাদের তৃপ্তির ঢেকুর তোলার কিছু নেই। বিভিন্ন কারনে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মূখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। একটি দুর্যোগই শেষ নয়। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ আমাদের আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে রেখেছে। কখনো আইলা, কখনো করোনা, বা আম্মান। রয়েছে পঙ্গপালের আশংকা। এটা কিছুটা চলমান প্রক্রিয়ায় রুপান্তরীত হচ্ছে। মানব সভ্যতার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের ভুমিকাই নির্ভর করছে আমাদের টিকে থাকার সক্ষমতা।

লেখকঃ
কৃষিবিদ মোঃ শরীফ হোসেন
উন্নয়ন গবেষক
sharif7049@gmail.com





সম্পাদক ডাঃ মোঃ মোছাব্বির হোসেন
ঠিকানা: বাসা-১৪, রোড- ৭/১, ব্লক-এইচ, বনশ্রী, ঢাকা
মোবাইল: ০১৮২৫ ৪৭৯২৫৮
agrovisionbd24@gmail.com

© agroisionbd24.com 2019